ক্যামেরনের বিস্ময়কর জয়

অপ্রত্যাশিতভাবে সবাইকে চমকে দিয়ে আবারও বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন ডেভিড ক্যামেরন। বানের পানির মতো তিনি ভাসিয়ে দিয়েছেন বিরোধী দল লেবার, লিবারেল ডেমোক্রেট ও ইউকে ইনডিপেনডেন্স পার্টিসসহ সবাইকে। পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে এ দলগুলোর নেতা যথাক্রমে এড মিলিব্যান্ড, নিক ক্লেগ ও নাইজেল ফারাজ পদত্যাগ করেছেন। হারিয়েত হারম্যানকে অস্থায়ীভাবে দেয়া হয়েছে লেবার দলের দায়িত্ব। অন্যদিকে ডেভিড ক্যামেরনকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হচ্ছে না। কারও ওপর ভর না করে তিনি একাই এখন সরকার গঠন করতে পারছেন। এমপিরাসহ প্রধানমন্ত্রী আগামী ১৮ই মে শপথ নেবেন বলে জানিয়েছে অনলাইন হারেটজ পত্রিকা। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বুথফেরত জরিপ, জনমত জরিপ, রাজনৈতিক বোদ্ধাদের পূর্বাভাসকে মিথ্যে প্রমাণ করে তিনি নিজেকে ও সেই সঙ্গে দলকে নিয়ে গেলেন ভিন্ন এক উচ্চতায়। তাই তার কনজারভেটিভ শিবিরে আনন্দ সীমাহীন। নির্বাচনের আগে তিনি ১০ ডাউনিং স্ট্রিট ছেড়ে গিয়েছিলেন। গতকাল যখন কনজারভেটিভ দল তার লক্ষ্যের দিকে ক্রমেই এগিয়ে যেতে থাকে তখন ডেভিড ক্যামেরন বুঝে গিয়েছেন তিনিই হচ্ছেন আগামীর প্রধানমন্ত্রী। তাই তিনি চিরসঙ্গী সামান্থা ক্যামেরনকে সঙ্গে নিয়ে আবার ছুটে যান সেই ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে। আর বিশ্লেষকরা, বোদ্ধারা অবাক বিস্ময়ে শুধু হিসাবের পরিসংখ্যানের হিসাব মিলাচ্ছিলেন। কিছুতেই যখন হিসাব মিলছিল না তখনই তিন বড় দলের নেতা পরাজয় স্পষ্ট বুঝতে পারেন তারা মঞ্চ থেকে পিছলে পড়েছেন। ফলে সঙ্গে সঙ্গে তারা পদত্যাগের ঘোষণা দেন। বৃটিশ পার্লামেন্টের আসন সংখ্যা ৬৫০টি। এর মধ্যে কোন দল যদি ৩২৬টি আসন পায় তাহলে তার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পূরণ হয় এবং ওই দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারে। কিন্তু ৩২৬ নয়, ৩৩১ আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ডেভিড ক্যামেরনের কনজার্ভেটিভ পার্টি। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দল লেবার দল। তারা অর্জন করেছে ২৩২টি আসন। স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি পেয়েছে ৫৬ আসন। লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছে ৮টি আসন। ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টি পেয়েছে ৮ আসন। অন্য দলগুলো মিলে পেয়েছেন ১৫টি আসন। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা পূর্বাভাসে বলেছিলেন, কনজার্ভেটিভ ও লেবার পার্টি কোন পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। তারা হয়তো ২৭৩টি করে আসন পেতে পারে। ফলে সরকার গঠন করতে হলে ছোট দলগুলোর ওপর ভর করতে হবে। সেভাবে গঠিত পার্লামেন্ট হবে ঝুলন্ত। তার স্থায়িত্ব হবে স্বল্প সময়ের। এমনকি এক নেতা তো আগামী বড়দিনের আগেই আরেকটি নির্বাচন দিতে হবে এমন এক পরিস্থিতির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। কিন্তু ধোপে টেকেনি কোন যুক্তি। মানুষ তার গোপন ব্যালটে সব হিসাব পাল্টে দিয়েছে। তবে গতকাল সকালের দিকে বিবিসি যে এক্সিট পোল বা বুথফেরত জরিপ প্রকাশ করে তাতে বলা হয় কনজারভেটিভ পার্টি ৩১৯ বা ৩৩১ আসন পেতে পারে। শুধু সেই হিসাবটিই বলা চলে শতভাগ সত্যে পরিণত হয়েছে। এভাবে যে বিজয় অর্জিত হয়েছে তাকে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন মধুরতম বিজয় বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, কয়েক প্রজন্মের মধ্যে এটা দলের জন্য মধুরতম বিজয়। তিনি আরও বলেন, আমি এক এক দল এবং সরকারে নেতৃত্ব দিতে চাই- যে দল- যে সরকার এক জাতি এবং অখণ্ড যুক্তরাজ্যে বিশ্বাসী। এ বিশ্বাসকে আমি পুনরুদ্ধার করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি গতকাল ডাউনিং স্টিটে ফেরার পরে সাক্ষাৎ করেছেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। এখন রানিই তাকে আমন্ত্রণ জানাবেন সরকার গঠনের জন্য। ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নে বৃটেনের সদস্যপদ নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠান ও কনজারভেটিভের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবেন তিনি। ওদিকে নির্বাচনে স্কটল্যান্ডে ভূমিধস বিজয় পেয়েছে স্বাধীনতাপন্থি স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (এসএনপি)। তারা স্কটল্যান্ডের মোট ৫৯ আসনের মধ্যে ৫৬ আসনে বিজয়ী হয়েছে। স্কটল্যান্ডে ৪০টি আসন হারিয়েছে লেবার দল। বাকি ৩টি আসন পেয়েছে অন্যান্য দল। এর ফলে স্কটিশরা এবার তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে আবারও গণভোটের ডাক দিতে পারে। যদি সেটাই হয় তাহলে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে। এরই মধ্যে এসএনপির এমপি অ্যালেক্স স্যামন্ড হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন ডেভিড ক্যামেরনকে। তিনি বলেছেন, স্কটল্যান্ডের সিংহরা গর্জে উঠেছি। এর মধ্য দিয়ে তিনি আসলে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটে বৃটেনের অখণ্ডতার বিষয়ে ডেভিড ক্যামেরন জোর দিয়েছেন। তিনি কি পারবেন এসএনপিকে স্বাধীনতার জন্য ওই গণভোট আহ্বান বন্ধ করাতে। নিকোলা স্টারজেনের নেতৃত্বে এসএনপি বিজয়ী হওয়ার পর থেকে বৃহস্পতিবারের রাতটি মধুর রাত হিসেবে ধরা দেয় স্কটল্যান্ডে। এ রাতে স্কটিশরা নির্ঘুম কাটিয়েছেন। তারা রাস্তায় বেরিয়ে বাঁশি বাঁজিয়ে, গাড়ির হর্ন বাজিয়ে, নেচে-গেয়ে উল্লাস করেছেন। অন্যদিকে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল নির্বাচনী ফল সরাসরি প্রকাশ করছিল। সেখানে উপস্থিতরা মাঝেমধ্যেই পুলকিত হয়ে উঠছিলেন। কেউ বা খেই হারিয়ে ফেলছিলেন। কারণ, নির্বাচনের এমন ফলের জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলেন না। কনজারভেটিভদের এমন মধুর বিজয় দেখেই বৃটেনের শেয়ারবাজার হঠাৎ চাঙ্গা হয়ে ওঠে। সূচক তর তর করে উঠে যেতে থাকে ওপরে। এক্সিট পোল যখন পূর্বাভাস দেয় যে ডেভিড ক্যামেরনের কনজার্ভেটিভ পার্টি আবার সরকার গঠন তরতে পারে সঙ্গে সঙ্গে পাউন্ডের দাম শতকরা এক ভাগ বেড়ে ১.৫৪ ডলারে দাঁড়ায়। নির্বাচনে বিজয় অর্জন ছিল ডেভিড ক্যামেরনের জন্য প্রথম লড়াই। এখন তার সামনে দ্বিতীয় লড়াই অপেক্ষা করছে। তা হলো গ্রেট বৃটেনের অখণ্ডতা রক্ষা করা। তা করতে ডেভিড ক্যামেরনকে আপসের পথে যেতে হবে। যদি তিনি এসএনপির প্রধান নিকোলা স্টারজেনকে আরও ক্ষমতা, এর মধ্যে রয়েছে নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থা, দিয়ে থামাতে পারেন তাহলে হয়তো অখণ্ডতা ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে। ডেইলি মেইল খবর দিয়েছে, স্কটল্যান্ডে ৫৬ আসন জিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পর এরই মধ্যে নিকোলা স্টারজেন তার দাবির তালিকা করা শুরু করেছেন। তিনি কৃচ্ছ্রসাধন ও হলিরুডের জন্য আরও শক্তি চাইতে পারেন।

মানবজমিন

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s