সম্প্রচার নীতিমালা ‘ভিন্নমত প্রকাশের হুমকি’

সম্প্রচার নীতিমালা নামক ‘বিপজ্জনক অস্ত্র’ তৈরি করেছে সরকার। এর মাধ্যমে গণমাধ্যমের ওপর খ্তগ নেমে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া কর্মীদের মধ্যে এক অজানা আতঙ্ক। যেন কোন দানব তাদের তাড়া করছে
। যে কোন সময় ঘায়েল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত সোমবার মন্ত্রিসভা বৈঠকে অনুমোদিত জাতীয় সমপ্রচার নীতিমালা নিয়ে এমন অভিমত দেশের বিশিষ্টজনদের। তারা বলছেন, সমপ্রচার নীতিমালা তৈরির মাধ্যমে আবার বাকশাল প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার। তারা একদলীয় শাসনের দিকে যাচ্ছে। আমরা মনে করছি, একটি অগণতান্ত্রিক বা অনির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে সমপ্রচার নীতিমালা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। জাতীয় সমপ্রচার নীতিমালা নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বলেন, সমপ্রচার নীতিমালা নিয়ে এখনই সাংবাদিকদের কঠোরভাবে প্রতিবাদ করা উচিত। কারণ এ সমপ্রচার নীতিমালা তৈরির মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠার দিকে যাচ্ছে সরকার। তাই একটি অগণতান্ত্রিক বা অনির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে সমপ্রচার নীতিমালা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যে সরকারের গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই, প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের নির্বাচিত সরকার বলে সেই সরকার এ ধরনের সমপ্রচার নীতিমালা প্রণয়ন করতেই পারে। এ ধরনের নীতিমালা গ্রহণ করার অর্থ সাংবাদিকতার স্বাধীনতা হরণ করা। যে সরকার গণতন্ত্রকে বিশ্বাস করে না সেই সরকারের পক্ষ থেকে এটা আসাতে সমপ্রচার নীতিমালাকে কালাকানুন বলতে হবে। এটা সাংবাদিকতার স্বাধীনতা হরণের অশুভ দৃষ্টান্ত। পরবর্তী পর্যায়ে এটি আইন করা হবে। যে দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রয়েছে সেই দেশে সাংবাদিকদের দায়িত্ব নিয়ে সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা, সততা রক্ষা করতে হয়। সরকারের কাছে এর বিচার বিশ্লেষণের ভার দেয়া ঠিক নয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মানে হলো সত্য বলা এবং অসত্য না বলা। তিনি বলেন, সত্য ও অসত্য বিচার করার জন্যই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রয়োজন। এ ধরনের নীতিমালা প্রেস কাউন্সিল বা সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে এলে ভাল হতো। এ নীতিমালায় একটি কথা বলা হয়েছে, নীতিমালা পরিচালনার জন্য একটি কমিশন থাকবে। এ দেশে কোন কমিশনই স্বাধীন নয়। নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতাকে সরকার ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ধ্বংসের উদ্যোগ নিয়েছে। সুতরাং আমি মনে করি নীতিমালা তৈরি সরকারের ধোঁকাবাজিরই অংশ। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বলেন, এ নীতিমালার মাধ্যমে দুর্নীতিপরায়ণদের দুর্নীতি করার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। তাদের রক্ষার জন্য এটা করা হয়েছে। এটা গণবিরোধী নীতিমালা। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলা যাবে না- এটা হতে পারে না। দেশে এখন সব কিছুতে দুরভিসন্ধি চলছে। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব সব চ্যালেঞ্জ করে বাকশাল কায়েমের চেষ্টা কারা করছে এটা খতিয়ে দেখা দরকার। বড় ধরনের কালাকানুনের বিরুদ্ধে এখনই প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হাফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন, জাতীয় সমপ্রচার নীতিমালা কি উদ্দেশ্যে করা হয়েছে তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। নীতিমালায় কিছু বিষয় স্পষ্ট করা হয়নি। যেমন পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্য সদস্যরা দুষ্কর্ম করলে মিডিয়া কি হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে? নারায়ণগঞ্জের ঘটনা মিডিয়ার কারণেই ব্যাপকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেন, স্বাধীন গণমাধ্যম হলে দেশ, জাতি সবাই ভাল থাকবে। বিদেশেও দেশের ভাবমূর্তি উন্নত হবে। এ বিষয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন, প্রস্তাবিত সমপ্রচার নীতিমালা নিয়ে আমাদের আশঙ্কা ছিল, এর মাধ্যমে সমপ্রচারমাধ্যমগুলো সঙ্কুচিত হবে। এখন দেখছি, সেই আশঙ্কা রয়েই গেল। সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ বলেন, জাতীয় সমপ্রচার নীতিমালা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থি এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের প্রস্তুতি। ভিন্নমত প্রকাশের যে ব্যবস্থা আছে তার প্রতি হুমকি। এ ধরনের একটি নীতিমালা সরকার কেন করলো তা বুঝতে হলে আমাদের একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, সেটা হলো সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় তথ্য নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এ কারণে সরকারের গণতন্ত্রবিরোধী আচরণ। সরকার যদি এ নীতিমালার মাধ্যমে মনে করে থাকে তারা বিরোধী মতামতকে দমন করতে পারবে এবং ফ্যাসিবাদী কায়দায় নিজেদের মতামত অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারবে বা অন্যদের গলাধঃকরণে বাধ্য করতে পারবে তাহলে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। হিটলারের জার্মানিতে এ ধরনের পরিস্থিতি হয়েছিল। কিন্তু নাৎসিদের সেই ফ্যাসিবাদী কার্যক্রম দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়নি। এ দেশে ক্ষমতাসীন সরকার যে ব্যবস্থার অধীনে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে যাচ্ছে, একদিন সম্ভবত সেটা তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান (প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায়) অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, গণমাধ্যম নীতিমালায় যেসব কথা বলা হয়েছে তার বেশির ভাগই গ্রহণযোগ্য। তবে অসত্য, বিভ্রান্তিকর তথ্য বা আরও যেসব কথা বলা হয়েছে ওইগুলোর বিচার কে করবে? বিদেশী মিডিয়া’র টক শো দেখলে আপনি নানা কিছু দেখতে পারবেন। একটি কমিশনের মাধ্যমে নীতিমালার সব কিছু বিচার করলে ভাল হবে। এতে মতদ্বৈততা সৃষ্টির সুযোগ কম থাকবে। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, গত সোমবারের দিনটি গণমাধ্যমের ইতিহাসে আরেকটি কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের জন্য এ নীতিমালা অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এটা কার্যকর হলে কোন ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না। নীতিমালায় বলা হয়েছে, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কোন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি প্রকাশ করা যাবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে কোন সংবাদ প্রকাশ করা যাবে না। তার মানে কি পুলিশ-র‌্যাব কাউকে খুন করলেও প্রকাশ করা যাবে না? আসলে একটি অবৈধ সরকার তার ক্ষমতাকে ধরে এ ধরনের একটি কালাকানুন অনুমোদন দিয়েছে। একই সঙ্গে আগামী দিনের আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়ন্ত্রণ করাও তাদের উদ্দেশ্য। এ দেশের গণমাধ্যম এমন কোন কাজ করেনি যে তাদের গলায় ফাঁস পরাতে হবে। ১৯৯০ সালে অর্জিত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যে কোন মূল্যে রক্ষা করা হবে। কলামনিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, সরকার তার বিরোধী কণ্ঠস্বরকে দমন করার হাতিয়ার হিসেবে জাতীয় সমপ্রচার নীতিমালাকে ব্যবহার করবে। এ ছাড়া আর কোন উদ্দেশ্য নেই। এর মাধ্যমে সমপ্রচার ব্যবস্থাকে উন্নতির কোন চেষ্টা নেই। এটা সম্পূর্ণ কালো আইন ও বিধিমালা হবে। এ নীতিমালার কারণে সাংবাদিকরা অনুসন্ধানী রিপোর্ট করতে পারবেন না। জাতীয় স্বার্থের কথা বলে বিরোধী দলের কণ্ঠ রোধ করা হবে। তিনি বলেন, টক শোতে কেউ তথ্য নিয়ে যান না। টক শো মানে মতামত প্রকাশ ও পর্যবেক্ষণ। পর্যবেক্ষণের সঙ্গে তথ্যের কোন সম্পর্ক নেই। এটা একটা দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা। টক শোতে যারা যান সেখানে তারা তাদের মতামত প্রকাশ করেন। সেখানে তথ্যের কোন প্রয়োজন নেই। আমি যদি টক শোতে গিয়ে বলি সরকার ভাল কাজ করছে না এবং আরেকজন যদি বলেন সরকার ভাল কাজ করছে, সেখানে তথ্যের কোন বালাই নেই। চাতুর্যের মাধ্যমে গণতন্ত্র, গণমাধ্যম এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে নষ্ট করার হাতিয়ার হিসেবে সমপ্রচার নীতিমালা ব্যবহার হতে পারে। ৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের আগে থেকেই তারা মিডিয়ার ওপর বিরূপ। তারা চায় মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে। ওই নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে সমপ্রচার নীতিমালা তৈরি ও মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
দৈনিক নিউএইজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবীর তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সমপ্রতি প্রণীত জাতীয় সমপ্রচার নীতিমালা জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ বিশেষণের প্রতি একটি জনবিচ্ছিন্ন ও স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের ভীত-সন্ত্রস্ত প্রতিক্রিয়া ছাড়া কিছু নয়। এই নীতিমালা অসাংবিধানিক, অগণতান্ত্রিক ও সমাজের সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পরিপন্থি একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার। জনসাধারণের গণতান্ত্রিক আকাঙক্ষাকে দমনের জন্য ও সরকারের গণবিরোধী তৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষাকে স্তব্ধ করার জন্যই নাগরিকদের মতামত প্রকাশের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্বকারী এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এই স্বৈরতান্ত্রিক সরকারি নীতিমালার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই মিডিয়া কর্মীরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সমাজের সকল গণতন্ত্রপরায়ণ মানুষের উচিত এই প্রতিবাদে শামিল হওয়া। কারণ মিডিয়ার গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার সঙ্গে সমাজের সাধারণ গণতান্ত্রিক রূপান্তর সরাসরি জড়িত।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s