ভাসছে লাশ স্বজনদের বিক্ষোভ

শনাক্ত হয়নি ডুবে যাওয়া লঞ্চ এমভি পিনাক ৬-এর। মাওয়া ঘাট থেকে ২০ কিলোমিটার ভাটি পর্যন্ত অনুসন্ধান করেছে নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল। লঞ্চটির অবস্থান শনাক্ত না হলেও পদ্মার বিভিন্ন স্থানে ভেসে উঠছে লাশ। অভিযোগ উঠেছে লাশ পচে যাওয়ায় সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার করছেন না। পদ্মা নদীর মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়ায় গতকাল ১টি লাশ উদ্ধার করেছেন সাধারণ মানুষ। লাশ উদ্ধারের পর সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন তারা। এদিকে, চাঁদপুর, মাদারীপুর ও ভোলায়  উদ্ধার হয়েছে ১৫টি লাশ। গতকাল রাতে মুন্সীগঞ্জের কমলনগর এলাকায় নদী থেকে এক যুবতীর লাশ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের ধারণা এটিও ডুবে যাওয়া লঞ্চের যাত্রীর লাশ।
সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ১৯টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। প্রায় সব লাশই উদ্ধার করছেন নিখোঁজদের স্বজন ও সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ। উদ্ধারকারীদের ওপর ভরসা না রেখে গতকাল তারা নিজেরাই অনেকে  নৌকা, স্পিডবোট  ভাড়া করে নদীতে লাশের সন্ধান করছেন। নদীর স্রোতের কারণে লাশ উদ্ধার হচ্ছে ভাটিতে। তাই অনেকে মাওয়া ফেরিঘাটে অপেক্ষা না করে লাশের আশায় মাদারীপুর ও শরীয়তপুর এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন। গতকাল পর্যন্ত মাওয়াঘাটে জেলা পুলিশ ক্যাম্পে নিখোঁজ হিসেবে ১৩৬ জনের নাম লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। গতকাল বিভিন্ন স্থানে ১১টি লাশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে বরিশালের ভোলার ইলিশা এলাকায় চারটি লাশ ভেসে ওঠে। দু’টি লাশ পাওয়া গেছে চাঁদপুরের হাইমচর এলাকায়। শরীয়তপুরে দু’টি, শরীয়তপুরের সুরেশ্বরে দু’টি এবং মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়ায় একটি লাশ পাওয়া গেছে। তার আগে মঙ্গলবার পাঁচটি লাশ পাওয়া যায়। তবে মুন্সীগঞ্জে ঘটনার দিন সোমবার হীরা ও হাসি নামে দু’জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত প্রায় সব লাশই উদ্ধার করেছেন সাধারণ মানুষ। ঘটনার তিনদিন অতিবাহিত হলেও উদ্ধারকারীদের মাধ্যমে কোন লাশ মুন্সীগঞ্জে উদ্ধার হয়নি। এমনকি পদ্মায় নিমজ্জিত লঞ্চ এমভি পিনাক ৬-এর কোন সন্ধান দিতে পারছেন না তারা। গতকাল বিকালে নৌকা ভাড়া করে পদ্মা নদীতে লাশ সন্ধান করতে দেখা গেছে নিখোঁজদের স্বজন ও সাধারণ মানুষকে। মাওয়া ফেরিঘাট থেকে জনপ্রতি ২০ টাকা করে ২০-২৫ জনের একটি দল নৌকা ভাড়া করে লাশ খুঁজতে বের হন। ওই দলে থাকা মাওয়ার জশলদিয়ার আজিম, শাহজাহান, সুমন ও কুমিল্লার সাগর জানান, শিমুলিয়া এলাকায় একটি লাশ দেখে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের তা উদ্ধারের অনুরোধ জানান। কিন্তু লাশের গন্ধের কারণে বিষয়টি তারা এড়িয়ে যান। পরে তারা নিজেরাই লাশ উদ্ধার করে সন্ধ্যায় মাওয়া ফেরিঘাটে জেলা পুলিশের ক্যাম্পে নিয়ে যান। এ সময় তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। জেলার সহকারী পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান বলেন,  কোন বাহিনীর কারা লাশ উদ্ধারে অনাগ্রহ দেখিয়েছে বিষয়টি স্পষ্ট না। উদ্ধারকৃত লাশটি একজন তরুণীর। তবে লাশটি ফোলা থাকায় বয়স কত হবে ধারণা করা যায়নি। এদিকে, নিমজ্জিত লঞ্চটি কোথায় আছে তা এখনও শনাক্ত করা যায়নি।  কোস্টগার্ডের উদ্ধারকারী দলের কর্মকর্তা স্টেশন কমান্ডার সা. লে. জাকির হোসেন জানান, এমভি পিনাক-৬ যে স্থানে নিমজ্জিত হয়েছে ওই স্থান থেকে এ পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার ভাটি পর্যন্ত অনুসন্ধান করা হয়েছে। কিন্তু লঞ্চের অবস্থান শনাক্ত করা যাচ্ছে না। তবে উদ্ধারকারী এই কর্মকর্তা জানান, আজ-কালের মধ্যেই লঞ্চের অবস্থান জানা যাবে। লঞ্চটি পাওয়া গেলে আরও লাশ পাওয়া যাবে বলে তিনি মনে করেন। তবে দেরি হয়ে গেলে লাশ উদ্ধার হলেও সে সব লাশ গলে যেতে পারে। এমনকি পরে এসব লাশ উদ্ধার হলেও শনাক্ত করা সম্ভব হবে না। উদ্ধারকারীরা মনে করছেন, প্রবল স্রোতে দুর্ঘটনার পরপরই অনেক লাশ ভেসে গেছে। শুরুর দিকে উদ্ধারকারী জাহাজ ঘটনাস্থলে যেতে দেরি হওয়ায় মুন্সীগঞ্জে শুরুর দিকের দু’টি এবং গতকাল একটি ছাড়া আর কোন লাশ উদ্ধার সম্ভব হয়নি।
গত সোমবার পিনাক-৬ লঞ্চটি যে স্থানে নিমজ্জিত হয় ওই স্থানে নদীর গভীরতা ৯০ ফুট বলে জানান মাওয়ার বন্দর কর্মকর্তা মহিউদ্দিন। লৌহজং টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত পদ্মার এই স্থানে ওই দিন ছিল প্রবল স্রোত। এদিকে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মঙ্গলবার বেলা ১১টায় কাণ্ডারি-২ নামে উদ্ধারকারী একটি জাহাজ যাত্রা করলেও গতকাল সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত তা এসে পৌঁছেনি। লাশ উদ্ধার প্রসঙ্গে লৌহজং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) মজিবর রহমান জানান, বিভিন্ন স্থানে উদ্ধার হওয়া লাশের মধ্যে ৭টি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থেকে হস্তান্তর করা হয়েছে। লাশগুলোর মধ্যে রয়েছে ফরিদপুরের নগরকান্দার মানিকপুরের আমির উদ্দিনের পুত্র জামাল হোসেন (২৯), একই এলাকার পোনোগ্রামের আবদুল হাই খালিকের মেয়ে রিতা আক্তার (২৫), মাদারীপুরের শিবচরের চন্দরখোলার নূর ইসলাম হাওলাদারের পুত্র মিজানুর রহমান (৩৫), ঝালকাঠি জেলার কাঁঠালিয়ার লুতফর রহমানের ছেলে ফাহাদ (২৫), শরীয়তপুরের জাজিরার হজপাড়ার জব্বার হাইয়ের মেয়ে জান্নাতুল নাঈমা লাকী (২০) ও দুর্ঘটনার দিন উদ্ধারকৃত মাদারীপুর জেলার শিবচড়ের নুরুল হকের মেয়ে ঢাকার শিকদার মেডিকেলের ছাত্রী হিরা (২২) এবং ওই এলাকার উতবাইলের আলম শেখের স্ত্রী হাসি বেগম (২৪)। এদিকে, গতকাল সন্ধ্যায় উদ্ধারকারী বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান। এ সময় সাংবাদিকরা লঞ্চডুবির ব্যর্থতার এই দায় নিয়ে তিনি পদত্যাগ করবেন কিনা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, গত বিএনপি সরকারের আমলের চেয়ে এই সরকারের আমলে দুর্ঘটনা কম হয়েছে। তাই পদত্যাগের প্রশ্নই ওঠে না। তবে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, আজ-কালের মধ্যেই লঞ্চের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
উদ্ধারকাজে নিয়োজিত বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম পরিচালক জহিরুল ইসলাম জানান, রাত ২টা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান শেষে পুনরায় সকাল ১০টা থেকে শুরু করা হয়েছে। লঞ্চ শনাক্ত কাজ অব্যাহত রয়েছে । কিন্তু রাত ৮টা পর্যন্ত ঘটনাস্থল ও তার আশপাশে নদীতে কিছুই পাচ্ছি না ।
লঞ্চডুবিতে নিখোঁজ মিজানুরের চাচা টেইলার মাস্টার মোতালেব হাওলাদার অভিযোগ করে বলেন, আজ ৩ দিন ধরে নদীর পাড়ে অপেক্ষা করছি। মনে হয় ইচ্ছা করেই এরা লঞ্চ তোলে না। কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে স্বজনদের আর ফিরে পাবো না। আমাগো টাকার দরকার নাই। আমাগো স্বজনদের ফিরাই দেন। তিনি আরও বলেন, এত বড় নদী আর এত যাত্রী এখানে পারাপার হয়, অথচ একটি উদ্ধারকারী জাহাজ থাকে না ।
মা আর দুই বোনকে হারিয়ে দুর্ঘটনা কবলিত লঞ্চ থেকে বেঁচে যাওয়া যাত্রী আনোয়ার হোসেন অপু ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আমরা আর কিছু চাই না। আমরা স্বজনের লাশ চাই। বড়  বড় দুর্ঘটনার লঞ্চ উদ্ধার হয় অথচ এই ছোট লঞ্চটি উদ্ধার করা যাচ্ছে না। তিন দিন ধরে ঘাটে বসে আছি ।
নিঁেখাজ পিতা মুসা মিয়ার (৬০) খোঁজে আসা ছেলে লক্ষ্মীপুর কমলনগর চর মার্টিন গ্রামের মো. জসিমউদ্দিন জানান, পদ্মার পাড়ে বাবার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুণছি। সন্ধান পাচ্ছি না। ঘাটে নির্মাণ করা তথ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করেও কোন লাভ হচ্ছে না। কর্তৃপক্ষ কি করছে তা-ও বুঝে উঠতে পারছি না ।
নৌমন্ত্রী আরেক ভাগ্নিসহ ৯ লাশ উদ্ধার
মুন্সীগঞ্জের পদ্মা নদীতে ডুবে যাওয়া এমএল পিনাক-৬ লঞ্চের আরও ৯ যাত্রীর লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর আগে সোমবার ও মঙ্গলবার দুদিনে তিনটি লাশ উদ্ধার হয়। এ পর্যন্ত মোট লাশ উদ্ধারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২তে।  গতকাল ভোলায় ৫ জন, চাঁদপুরে ২ জন ও শরীয়তপুর থেকে ২ জনের লাশ নদীতে ভাসমান অবস্থায় লাশ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে নৌমন্ত্রীর আরেক ভাগ্নির লাশও রয়েছে।
ভোলা প্রতিনিধি জানান, পদ্মায় ডুবে যাওয়া লঞ্চের এক যাত্রীর লাশ মেঘনার রামদাসপুর এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। তার পরিচয় পাওয়া গেছে। তিনি হলেন- ঢাকা তেজগাঁও কলেজের বিবিএ তৃতীয় বর্ষের ছাত্র সাইয়েদুল করিম ফাহাদ। গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া উপজেলায়। সকাল ১১টায় স্থানীয় প্রশাসন ফাহাদের মৃতদেহ তার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে। এদিকে কাচিয়া ইউনিয়নের  মেঘনার কাঠির মাথা এলাকা থেকে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তার বয়স আনুমানিক ৫৫-৬০ হবে। তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। এছাড়া মেঘনার ভাংতির খাল ও ইলিশার মোহনা থেকে আরও তিনটি লাশ উদ্ধার করা হয়। তাদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।
চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, গতকাল হাইমচরের মাঝিরবাজার ও মিয়ারবাজারে মেঘনা নদীর পাড় থেকে ভাসমান অবস্থায় ২টি লাশ উদ্ধার করা হয়। এদের মধ্যে একজনের বয়স হবে আনুমানিক ১৪-১৫। তার পরনে ছিল জিনসের প্যান্ট ও গেঞ্জি। আরেকহনের বয়স হবে আনুমানিক ৩৩ বছর।
শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, উপজেলার শ্রীপুর ও কাচিকাটা থেকে দুইজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এরমধ্যে নৌমন্ত্রীর আরেক ভাগ্নি জান্নাতুন নাঈম লাকির (২২) লাশও রয়েছে। নিহত লাকি নৌপরিবহনমন্ত্রী খালাতো বোনের মেয়ে। লাকির মামা মো. ইলিয়াস সকালে লাশটি শনাক্ত করেন। তবে তিন বোনের মধ্যে নুসরাত জাহান হীরার মরদেহ দুর্ঘটনার দিনই উদ্ধার করা হয়। হীরার আপন বোন ফাতেমা জাহান স্বর্ণা এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। এদিকে কাচিকাটা ইউনিয়নের পদ্মা নদী থেকে এক পুরুষের লাশ উদ্ধার করা হয়। তার বয়স হবে আনুমানিক ৩০-৩৫ বছর। তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s